উহুদের প্রান্তরে

উহুদের প্রান্তরে  - আরজু আহমাদ ভাই।



উহুদের যুদ্ধে তীরন্দাজ বাহিনীর ভুলের কারণে বিশৃঙ্খল অবস্থা দেখা দেয়। ব্যাপক আক্রমণের মুখে মুসলিম বাহিনী বিক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

দ্বিমুখী আক্রমণে যখন মুসলমানগণ আত্মরক্ষামূলক অবস্থানের জন্য পাহাড়ের দিকে উঠতে থাকে তখন যে কয়েকজন মাত্র সাহাবী সে সময় রাসুল সা. এঁর পাশে থেকে লড়াই করে যাচ্ছিলেন তাঁর মধ্যে তালহা বিন উবায়দুল্লাহ ছিলেন অন্যতম।

যখন মুশরিকরা রাসুল সা. হত্যার উদ্দেশ্যে ঘিরে ধরার চেষ্টা করছিল তালহা তাঁর তলোয়ারকে বিদ্যুৎ বেগে বাম থেকে ডানে, ডানে থেকে বামে ঘুরিয়ে শত্রুদের একের পর এক আঘাত করে একাই ১১ জনের সেই দলকে পিছু হটতে বাধ্য করছিলেন।

তাঁর নিজের শরীরও শত্রুর অসংখ্য এলোপাথাড়ি তরোবারির আঘাতে হয়ে চলেছিল জর্জরিত। তালহা রা. নিজে বলেন, তাঁর শরীর সেদিন তরবারি, তীর, বর্শার সত্তরেরও অধিক আঘাতের শিকার হয়েছে।

সেই রকম অবস্থাতেই মুশরিকদের শ্রেষ্ঠতম তীরন্দাজ মালিক বিন জুহাইর রাসুল সা. এঁর মুখ মোবারক লক্ষ্য করে তীর ছুঁড়ে। তালহা রা. দেখামাত্রই নিজ হাত সেই দ্রুতগামী তীরের দিকে বাড়িয়ে দেন।

সেই তীরের ফলা তাঁর শাহাদাত এবং মধ্যমা আঙুলের হাড়সহ বিদ্ধ করে। তালহা রা. এঁর সেই হাত সেইদিন থেকে আমৃত্যু সেই আঘাতে প্যারালাইজড হয়ে ছিল।

আবু বক্বর রা. বলেন, আমি ও আবু উবায়দা যুদ্ধ করতে করতে রাসুল সা. থেকে কিছুক্ষণের জন্য বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলাম। ফেরার সময় দেখি, মুশরিক ও রাসুল সা. এঁর মাঝে যে একলা প্রতিরোধ গড়ে দাঁড়িয়ে লড়াই করছে সে তালহা!

সেদিনের সেই যুদ্ধে তালহা রা. এঁর মাথায় চারকোণা একটা ফাটল তৈরি হয়েছিল। ঘাড়ের একটা শিরা কেটে গিয়েছিল। সায়াটিক নার্ভ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। কোমর থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত যার প্রভাব বিদ্যমান ছিল।

আবু বাক্বার রা. বলেন, সেদিন অধিক রক্তপাতের দরুণ তালহা মারাত্মক দুর্বল হয়ে বেহুঁশ হয়ে পড়েছিল। রাসুল সা. তালহাকে উহুদ যুদ্ধে বীরত্বসূচক উপাধি প্রদান করেন। বলেন, ‘তালহাতু খাইরু উহুদ’। খাইর অর্থ শ্রেষ্ঠ, ভালো, কল্যাণকর।

এখানে ভাবানুবাদ হওয়া উচিত ‘বীরশ্রেষ্ঠ’। তালহা উহুদের বীরশ্রেষ্ঠ। এ থেকে প্রমাণ হয় যুদ্ধ শেষে বীরত্বসূচক উপাধি দেওয়া সুন্নাত। রাসুল সা. তাঁকে খন্দকের যুদ্ধে ‘তালহা তুল ফাইয়্যাজ’, ‘তালহা প্রাচুর্য্যপূর্ণ’ উপাধি দেন। হুনাইনের যুদ্ধে উপাধি দেন ‘তালহাতুল জুদ’ ‘তালহা মহৎপ্রাণ’।

তিনি ছিলেন অন্ত্যন্ত ধনী ও সফল ব্যবসায়ী। দানও করতেন প্রচুর। একবার তাঁর স্ত্রী বর্ণনা করেন, তিনি তাঁকে একরাতেই লোকেদের মাঝে ৪ লাখ দিরহাম দান করতে দেখেছেন।

আলী ইবনে জায়েদ বর্ণনা করেন, একবার এক বেদুইন তালহার কাছে এসে নিজের বংশের সাথে তাঁর বংশের আত্মীয়তার সম্পর্ক সম্বন্ধে বলল এবং তাঁর কাছে সাহায্য চাইল। তালহা রা. বললেন, আজকের আগে আত্মীয়তার সূত্র ধরে আমার কাছে কেউ কিছু চায় নি।

আমার কিছু জমি আছে, যা উসমান রা. ৩ লাখ দিরহামে আমার কাছ থেকে কিনতে চাইছেন। তুমি চাইলে তা নিয়ে নিতে পারো। অথবা উসমানের কাছে বিক্রির পর সেই সমুদয় অর্থ গ্রহণ করতে পারো। বেদুঈন দিরহাম গ্রহণের ইচ্ছে প্রকাশ করল।

তালহা রা. উসমান রা. এঁর কাছে বিক্রলব্ধ ৩ লাখ দিরহাম লোকটিকে দান করে দিলেন। কখনো এমন হয় নি, তাঁর কাছে কেউ কিছু চেয়েছে অথচ তিনি তা দেন নি। যেমন উপার্জন করেছেন, অকাতরে তেমনি বিলিয়েছেন।

মৃত্যুকালে তাঁর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ছিল ৩০ মিলিয়ন দিরহামেরও অধিক। কোনও সন্দেহ ছাড়াই বলা যায়, সেকালের ৩০ মিলিয়ন ছিল এখনকার ৩০ বিলিয়নের চেয়েও বেশি মূল্যবান। ইসলাম গ্রহণের আগে তিনি পরতেন জাফরান দিয়ে রঙ করা ও পারফিউমড জামা, রেশমের রুমাল।

তাঁর খেলার একটা রিং ছিল, যার কাঠামো ছিল সোনার, আর তাতে কারুকাজ করা ছিল পদ্মরাগমণির। এইসবই তাঁর তরুণ কালের কথা। সে সময়ই তিনি ব্যবসার কাজে সফর করতেন বিভিন্ন জায়গা। তাঁর ইসলাম গ্রহণের সাথেও এইরকম একটা ব্যবসায়িক সফরের চমৎকার কাহিনী রয়েছে।

তখন অবধি তাঁর বয়স পুরোপুরি আঠারোও পূর্ণ হয় নি, কোনও কোনও বর্ণনায় তো বলা হয়েছে তখন বয়স তাঁর পনেরো বছর। অথচ ব্যবসায় প্রসিদ্ধি গণ্ডি ছাড়িয়েছিল নিজ রাষ্ট্রের সীমা। তিনি ছিলেন প্রধানত কাপড়ের ব্যবসায়ী।

বসরার বাজারে গিয়েছেন সেবার ব্যবসার কাজে। এমন সময় শুনতে পান, একজন পাদ্রি ঘোষণা করছে, এখানে মক্কার কে আছে? তিনি জবাব দিলেন, আমি। পাদ্রী জিজ্ঞেস করলো, ‘আহমাদ কি আত্মপ্রকাশ করেছে?’ তিনি জিজ্ঞেস করলো, ‘কোন আহমাদ?’

পাদ্রী জবাব দিলেন, ‘আবদুল্লাহ বিন আব্দুল মুত্তালিবের পুত্র। তিনি এ মাসেই আত্মপ্রকাশ করার কথা। তিনিই হবেন সর্বশেষ নবী। আর দ্রুতই খেজুর গাছ সমৃদ্ধ আদ্র ও পাথুরে ভূমিতে তিনি হিজরত করবেন। অন্যেরা ঈমান আনার আগেই তোমার এ ব্যাপারে অগ্রবর্তী হওয়া উচিত’।

তালহা রা. বলেন, এই কথা শোনামাত্রই আমি মক্কার দিকে রওয়ানা হই। মক্কায় প্রবেশের পর আমি জিজ্ঞেস করি, কিছু ঘটেছে কি না! আমি আবু বাক্বারের সাথে আমার সাক্ষাত করলাম। আর রাসুলের কাছে গিয়ে অষ্টম ব্যক্তি হিসেবে আমি তখন ইসলামে প্রবেশ করি।

হিদায়তের জন্য, সত্য দ্বীনের জন্য- তালহা রা. এঁর এই দ্রুততা এটা প্রমাণ করে- তিনি একটা সত্য দ্বীন, প্রকৃত জীবন বিধান, প্রকৃত রবের দিকে ঝুঁকে যাবার জন্য আগ থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। তাই যখনই সন্ধান পেয়েছেন তখনই সেদিকে ছুটে গেছেন।

দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছেন। আর এমনভাবে আগলে ধরেছেন যে- কুরাইশরা ইসলাম গ্রহণের কারণে তাঁকে আর আবু বাক্বারকে একদিন একসাথে শক্ত করে রশিতে বেঁধে ফেলে রাখল, যাতে যার যেভাবে যত ইচ্ছে তাঁদেরকে পেটাতে পারে।

এ জন্য তাদের নাম হয়েছিল কারীনান, জোড়াবদ্ধ। ইসলাম গ্রহণের কারণে তাঁর ভাই তাঁকে কাঁধমোড়া করে বেঁধে নাকে টেনে ঘুরাত। তাঁর নাক ছিল খুব চিকন ও উঁচু, তাঁর নাকের জন্য তাঁকে কালো চেহারাতেও খুব সুন্দর দেখাত।

যেই ইসলামের জন্য তাঁদের এত ব্যাকুলতা সেই ইসলাম থেকে তো আজ আমরা ছুটে পালাই। যে গায়ে জাফরানি জামা শোভা পেত, সেই দেহ উহুদের প্রান্তরে রক্তাক্ত হয়ে পড়েছিল পাথুরে গর্তের মুখে। কিসের জন্য? কেবল ইসলামের উপর অবিচলতার জন্যই তো।

আফসোস, আমাদের নিজেদের উপর! ইসলাম থেকে তো আমরা তো দূরে সরে যেতে যেতে প্রায় বিচ্যুতই হয়ে গেছি। কতজনই তো এমন কত মিলিয়োনার, বিলিয়োনারকে আইকন মেনে এগোয়, কত স্বপ্ন বুনে তাদের মতন হয়ে উঠবার।

কত মোটিভেশন খোঁজে তাদের মধ্যে। অথচ সবচে’ ব্যর্থদের তালিকায় তো তারা। এক টাকা ছাড়া কি আছে তাদের? মৃত্যুর সাথে সাথে তো সব শেষ। জাহান্নামের আগুন তাদের স্বাগত জানাতে অপেক্ষা করে আছে! কি লাভ এই অনুসরণে?

যদি মিলিয়োনার বিলিয়োনারের থেকেই মোটিভেশান নিতে হয়, হে তরুণ কেন তবে তালহা বিন উবায়দুল্লাহর কাছ থেকে নাও না? তোমার রাসুল তো তাঁর সঙ্গীদের মধ্য থেকে এইরকম দৃষ্টান্তও তোমাদের জন্য রেখে গেছেন।

হয়ত কখনো এ দেশে চাকরির পরীক্ষায় আসবে না- তবুও তালহা রা. এঁর উপাধি তিনটা আমাদের স্মৃতিতে থাকুক। কখনো কখনো মনে করার চেষ্টা করলে তালহা রা.কেও মনে পড়বে। মনে পড়বে কী ভীষণ ত্যাগ ছিল, ভালোবাসা ছিল রাসুলের প্রতি। আমাদের মাঝেও সঞ্চারিত হোক সেই ভালোবাসা।

ক্যাটাগরি
আর্কাইভ